তেজ ঘুঁচিয়ে দেব
সন্ধে নামছে ধীরে ধীরে। কুয়াশায় ঢাকা গ্রামের পথঘাট, চায়ের দোকানগুলো থেকে ধোঁয়া উড়ছে, আর ঠিক তখনই আবির পা দিলো চৌধুরী পাড়ায়। তার চোখে রাগের আগুন, চোয়াল শক্ত, মুঠি আঁটা। সামনে যার জন্য এসেছে, তার নাম রাজু—এই গ্রামের সবচেয়ে ভয়ংকর দাদাগিরি করা ছেলে।
রাজু ছোটবেলা থেকেই ভয় দেখিয়ে সবাইকে চুপ করিয়ে রাখত। মাঠে খেলতে দিত না, দোকানে লাইন ভেঙে আগে নিত, ছোটদের মারধোর তো নিত্যকার ঘটনা। কেউ প্রতিবাদ করলেই—"তোর তেজ ঘুঁচিয়ে দেব!" এই হুমকিই ছিল তার ট্রেডমার্ক।
কিন্তু আবির আলাদা। সে শহরে থাকত, লেখাপড়া করেছে, কিন্তু এখন ফিরে এসেছে গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করতে। ফিরেই দেখেছে—গ্রামটা যেন রাজুর একচ্ছত্র রাজত্ব। কেউ হাসতেও রাজুর অনুমতি ছাড়া পারে না।
আজ বিকেলে আবিরের ছোট ভাই রিজু এসে কাঁদতে কাঁদতে বলল, "ভাই, রাজু আমার সাইকেলটা কেড়ে নিয়েছে। কিছু বলতেই বলল—তোর তেজ ঘুঁচিয়ে দেব!"
এইবার আবিরের ধৈর্য ভেঙে যায়। সে জানে, ভয় পেলে হবে না, এদের সাহসের মোকাবিলা সাহস দিয়েই করতে হয়।
চৌধুরী পাড়ার মোড়ে রাজুর গ্যাং আড্ডা দিচ্ছিল। আবির গিয়ে সোজা দাঁড়াল সামনে।
"রাজু, আমার ভাইয়ের সাইকেলটা ফেরত দাও। আর কারও সাথে এমন করলে এবার পুলিশে দেব," আবির বলল দৃঢ় কণ্ঠে।
রাজু হেসে উঠল। "ওই! তুই আমায় শিখাবি? তোরও তেজ ঘুঁচিয়ে দেব!"
আবির চুপচাপ রাজুর দিকে এগিয়ে গেল, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, "তেজ ঘুঁচিয়ে দেওয়ার দিন শেষ, রাজু। এবার সত্যি মানুষ হবে, না হলে তোর জন্যও ব্যবস্থা হবে।"
এই প্রথমবার রাজু একটু পিছিয়ে গেল। আবিরের চোখে কিছু ছিল—ভয় নয়, ছিল আত্মবিশ্বাস। রাজু বুঝল, এই ছেলেটাকে ভয় দেখানো যাবে না।
লোকজন জড়ো হতে শুরু করল। সবাই অবাক হয়ে দেখছে—একজন অবশেষে রাজুর সামনে রুখে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই ফিসফিস করে বলছে, "সত্যি, এবার রাজুর তেজ ঘুঁচে যাবে মনে হচ্ছে!"
রাজু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, "ঠিক আছে, তোর ভাইয়ের সাইকেল ফেরত দিচ্ছি।"
আবির চলে গেল। পেছনে তখন কেউ বলছে, "সাহসই আসল শক্তি।"
সেদিন থেকে রাজুর গলা একটু নরম হয়েছে, আর আবির? সে এখন গ্রামের নতুন আশার নাম।
