প্রবাসের চটি গল্পের কাহিনী


প্রবাসে দুই হৃদয়ের মা

নিউ জার্সির ছোট্ট এক শহরে, যেখানে গাছের পাতা শরতের রঙে রাঙা, সেখানে রহিমা বেগমের ছোট্ট সংসার।
বাংলাদেশ থেকে প্রায় দুই দশক আগে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি আর তার স্বামী রফিকুল ইসলাম।
দুজনের বয়স তখন কম ছিল না, তবু স্বপ্ন ছিল বড়। এখন তাদের জীবন একটু স্থিতিশীল, একটু আরামের। রফিকুল একটি টেক কোম্পানিতে মিড-লেভেল ম্যানেজার, আর রহিমা? তিনি বাড়ির হৃদয়, দুই ছেলে রাহি আর রিয়ানের মা।
রাহি অষ্টম শ্রেণিতে, রিয়ান ষষ্ঠ..
দুই ভাইয়ের বয়সের পার্থক্য মাত্র দেড় বছর, দেখতে প্রায় জমজ। তবে তাদের মন আর আচরণে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত।রহিমার চেহারা খুব একটা লাস্যময়ী নয়। মাঝারি গড়ন, মুখে সরল হাসি, চোখে একটা গভীর শান্তি। তবে তিনি মডার্ন।
বাংলাদেশের ঢাকার সেই ট্র্যাডিশনাল শাড়ি-পরা রহিমা এখন জিন্স আর টপে বেশ স্বচ্ছন্দ। তিনি যখন ছেলেদের স্কুলের পিটিএ মিটিংয়ে যান, তখন তার বাঙালি টোন আর আমেরিকান স্টাইলের মিশেল সবাইকে মুগ্ধ করে। তবে রহিমার আসল জাদু তার ছেলেদের সঙ্গে। রাহি আর রিয়ানের সঙ্গে তার সম্পর্ক এমন, যেন তিনজন বন্ধু।সকালের শুরুরহিমা সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই রান্নাঘরে যান। রফিকুল ইতোমধ্যে অফিসের জন্য তৈরি।
রাহি আর রিয়ানের ঘুম ভাঙানোর দায়িত্ব রহিমার।
"রাহি, রিয়ান, উঠো! স্কুলের বাস ছাড়বে!" রহিমার গলায় মিষ্টি ধমক। রাহি, যে একটু গম্ভীর আর চিন্তাশীল, বিছানা থেকে উঠে মুখ গোমড়া করে বলে, "আম্মু, আর পাঁচ মিনিট!"
রিয়ান, বেশি চঞ্চল আর হাসিখুশি, লাফ দিয়ে উঠে বলে, "আমি রেডি! আম্মু, আজ প্যানকেক বানাবে?"
রহিমা হেসে বলেন, "প্যানকেক আর ম্যাপেল সিরাপ রেডি তবে রাহি, তুমি যদি আর ঘুমাও, তাহলে রিয়ান তোরটা খেয়ে ফেলবে!"
এটা শুনে রাহি তড়িঘড়ি উঠে পড়ে।
সকালের নাস্তার টেবিলে তিনজনের হাসি-ঠাট্টায় বাড়িটা জীবন্ত হয়ে ওঠে। রফিকুল অফিসে বেরিয়ে যান, আর রাহি-রিয়ান স্কুলবাসে চড়ে স্কুলে রওনা দেয়।
রহিমা তখন বাড়ির কাজে ব্যস্ত হন। তবে তার মন পড়ে থাকে ছেলেদের কাছে। রাহি আর রিয়ান বড় হচ্ছে, কিশোর বয়সের দোরগোড়ায়। এই বয়সে তাদের মনে অনেক প্রশ্ন, অনেক কৌতূহল। আমেরিকার মতো উন্নত দেশে বেড়ে ওঠা এই দুই ছেলের জীবন বাংলাদেশের কিশোরদের থেকে অনেক আলাদা। তবু রহিমা চান, তারা যেন বাঙালি সংস্কৃতির শিকড় ধরে রাখে, আবার এই দেশের মাটিতেও মিশে যায়।
একটা সাধারণ দিন, এক শনিবার সকালে রহিমা ছেলেদের নিয়ে পার্কে যান। রিয়ান ফুটবল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে, আর রাহি বেঞ্চে বসে তার ফোন নিয়ে ব্যস্ত।
রহিমা রাহির পাশে বসে বলেন, "কী দেখছিস এত মনোযোগ দিয়ে?"
রাহি একটু লজ্জা পেয়ে বলে, "আম্মু, এটা স্কুলের প্রোজেক্ট।"
কিন্তু রহিমা জানেন, রাহি একটু লাজুক তার মনে অনেক কথা ঘুরপাক খায়, কিন্তু বলতে চায় না।
রিয়ান দৌড়ে এসে বলে, "আম্মু, আমার একটা বন্ধু বলল, তারা স্কুলে সে*ক্স এডুকেশন ক্লাসে কী কী শিখছে! আমাদের ক্লাসেও শুরু হবে, তুমি কী জানো এসব?"
রহিমা একটু হকচকিয়ে যান!!
আমেরিকার স্কুলে এই বিষয় নিয়ে পড়ানো স্বাভাবিক, কিন্তু বাঙালি মায়ের কাছে এটা এখনো একটু অস্বস্তির তবু তিনি হেসে বলেন, "জানি তো তবে তুই কী জানতে চাস, বল... আমি তোর আম্মু, আমার কাছে সব খুলে বলতে পারিস"
রিয়ান হাসে, "না, আম্মু, শুধু ভাবছিলাম, এটা কি সত্যি দরকার? মানে, আমি তো ইউটিউবে অনেক কিছু দেখে ফেলেছি!"
রাহি তখন মুখ তুলে বলে, "ইউটিউব থেকে সব শিখবি না, রিয়ান। আম্মু, তুমি বলো, আমাদের কী জানা উচিত?"
রহিমা বুঝতে পারেন, এটা তার ছেলেদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলার সময়...
তিনি শান্ত গলায় বলেন, "দেখ, রাহি, রিয়ান, এই বয়সে তোদের শরীরে, মনে অনেক পরিবর্তন আসবে। এটা খুব স্বাভাবিক। স্কুলে যা শেখাবে, সেটা জানার জন্য। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, নিজেকে আর অন্যদের সম্মান করা। আর কোনো কিছু বুঝতে না পারলে, আমার কাছে আসবি। আমি তোদের আম্মু, তোদের বন্ধুও"
রিয়ান মুচকি হেসে বলে, "আম্মু, তুমি কিন্তু কুল মা!"
রাহি চুপচাপ হাসে।
রহিমার বুক ভরে যায়। এই মুহূর্তগুলোই তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।বিকেলের আড্ডাবিকেলে রহিমা ছেলেদের নিয়ে বাড়ির পেছনের প্যাটিওতে বসেন। তিনি বাংলাদেশের গল্প শোনান—কীভাবে তিনি আর রফিকুল প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন, কীভাবে তারা আমেরিকায় এসে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন।
রিয়ান জিজ্ঞেস করে, "আম্মু, তুমি কি আব্বুকে প্রথম দেখায় পছন্দ করেছিলে?"
রহিমা হেসে বলেন, "না, তোর আব্বু তখন এত লাজুক ছিল, আমি ভেবেছিলাম, এই লোকের সঙ্গে কথা বলা যাবে না! কিন্তু পরে দেখলাম, তার হৃদয়টা সোনার"
রাহি বলে, "আম্মু, তুমি কি কখনো ভয় পাওনি? মানে, এত দূরে এসে, নতুন দেশে?"
রহিমা একটু থেমে বলেন, "ভয়? সবসময়। কিন্তু তোরা যখন এলি, তখন সব ভয় কেটে গেল। তোরা আমার সাহস।"
রাতে ডিনারে তিনজনে মিলে বাংলা খাবার রান্না করেন। রহিমা ছেলেদের শেখান কীভাবে ইলিশ মাছের ঝোল বানাতে হয়। রিয়ান মাছের কাঁটা নিয়ে বিরক্ত, আর রাহি খুব মনোযোগ দিয়ে রান্না শেখে। ডিনার টেবিলে তিনজনের হাসি, ঠাট্টা, আর ছোট ছোট ঝগড়া— এসবই রহিমার জীবনের সুর।
একদিন রাহি স্কুল থেকে ফিরে চুপচাপ। রহিমা বুঝতে পারেন, তার মনে কিছু চলছে।
রাতে, যখন রিয়ান ঘুমিয়ে পড়ে, রাহি রহিমার কাছে এসে বলে, "আম্মু, আমার একটা বন্ধু আছে, সে বলল, সে একটা মেয়েকে পছন্দ করে। এটা কি ঠিক?"
রহিমা হাসেন। তিনি রাহির হাত ধরে বলেন, "দেখ, পছন্দ করা খারাপ কিছু না। তবে এই বয়সে তোর প্রথম কাজ হলো নিজেকে গড়ে তোলা। পড়াশোনা, স্বপ্ন, নিজের লক্ষ্য — এগুলো এখন বড়। আর কাউকে পছন্দ করলে, তাকে সম্মান করবি, তার ভালো চাইবি"
রাহি মাথা নেড়ে বলে, "তুমি সবসময় এত সহজ করে বুঝিয়ে দাও, আম্মু।"
রহিমা হেসে বলেন, "তোরা আমার কাছে সবসময় সহজ।"
রহিমার জীবন সহজ নয়, প্রবাসে একা একা দুই কিশোর ছেলেকে মানুষ করা, তাদের মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতি আর আমেরিকান জীবনের ভারসাম্য রাখা—এটা চ্যালেঞ্জ তবু রহিমার হাসি কখনো ম্লান হয় না। রাহি আর রিয়ান তার জীবনের আলো। তাদের ছোট ছোট প্রশ্ন, তাদের হাসি, তাদের স্বপ্ন—এসবই রহিমাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
এক রাতে, যখন তিনজনে মিলে বাংলা সিনেমা দেখছেন, রিয়ান বলে, "আম্মু, তুমি কি জানো, আমি বড় হয়ে তোমার মতো কুল হতে চাই?"
রাহি হাসে, "আর আমি চাই তোমার মতো শক্তিশালী হতে, আম্মু।"
রহিমার চোখে পানি চলে আসে। তিনি বলেন, "তোরা ইতিমধ্যে আমার থেকে অনেক বেশি...।
সমাপ্ত..

Post a Comment